কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা : আনআম, আয়াত : ৯৮
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ هُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡشَاَكُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ فَمُسۡتَقَرٌّ وَّ مُسۡتَوۡدَعٌ ؕ قَدۡ فَصَّلۡنَا الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّفۡقَهُوۡنَ ﴿۹۸﴾
সরল অনুবাদ
(৯৮) আর তিনিই তোমাদের একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসস্থান রয়েছে। নিশ্চয়ই আমি অনুধাবনকারী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী বিশদভাবে বিবৃত করেছি।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা আনআমের ৯৮ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে যে মানুষের জীবন শুধু একটি ক্ষণস্থায়ী অবস্থান নয়, বরং এটি এক ধারাবাহিক সফর। এক মনজিল থেকে আরেক মনজিলে গমন।
১. مُسْتَقَرٌّ ও مُسْتَوْدَعٌ দুটি জীবনের দুই পর্ব
এই আয়াতে দুটি শব্দ এসেছে—مُسْتَقَرٌّ (মুস্তাক্বার) ও مُسْتَوْدَعٌ (মুস্তাওদা‘)। প্রথমটি قرار মূলধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ স্থিতি বা স্থায়িত্ব। কোনো বস্তুর স্থায়ী অবস্থানস্থলকে বলা হয় মুস্তাক্বার।
অতএব, আল্লাহ তাআলা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তার জীবনে রয়েছে দুটি পর্ব। একটি স্থায়ী আবাস (مُسْتَقَرٌّ) এবং অন্যটি অস্থায়ী অবস্থান (مُسْتَوْدَعٌ)। মুফাসসিরগণ বলেছেন যে, এগুলোর ব্যাখ্যা নানাবিধ হতে পারে—
- কেউ বলেছেন, মায়ের গর্ভ মুস্তাওদা‘, আর দুনিয়া মুস্তাক্বার।
- কেউ বলেছেন, দুনিয়া মুস্তাওদা‘, আর আখেরাত মুস্তাক্বার।
- কেউ বলেছেন, কবর মুস্তাওদা‘, আর জান্নাত বা জাহান্নাম মুস্তাক্বার।
(ফাতহুল কাদীর, আইসারুত তাফসির, আত-তাফসিরুস সা‘দী)
এই ভিন্নতাগুলো আসলে কোনো বিরোধ নয়; বরং সবগুলো অর্থই কোরআনের ভাষার অন্তর্ভুক্ত সম্ভাবনার পরিধির মধ্যে পড়ে। কারণ মানুষ আসলে এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছে—যেমনটি আল্লাহ বলেন,
﴿لَتَرْكَبُنَّ طَبَقًا عَنْ طَبَقٍ﴾
‘তোমরা এক স্তর থেকে অন্য স্তরে অগ্রসর হতে থাকবে।’ (সুরা : আল-ইনশিকাক, আয়াত : ১৯)
২. মানবজীবনের ক্রমবিকাশমান মনজিলসমূহ
কোরআনের এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানবজীবনকে বিভিন্ন মনজিল বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়—
- পিতার পৃষ্ঠ (নুপ্তা বা বীজরূপে অবস্থান) — এটি মুস্তাওদা‘, কারণ এখানে মানুষ অস্থায়ী আমানত হিসেবে থাকে।
- মায়ের গর্ভ (গঠন ও বিকাশের স্থান) — এখানেও সে সাময়িক অতিথি, এক নির্ধারিত সময় পর চলে যাবে।
- দুনিয়ার জীবন — সামান্য স্থিরতা দেখা দিলেও এটিও সাময়িক, তাই এটিও এক মুস্তাওদা‘।
- কবর বা বরযখ — মৃত্যুর পরের অন্তর্বর্তী জগৎ, যেখানে মানুষ অপেক্ষায় থাকে পুনরুত্থানের।
- আখেরাত — জান্নাত বা জাহান্নাম—যেখানে প্রত্যেকের চিরস্থায়ী মুস্তাক্বার নির্ধারিত হবে।
এই মনজিলগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তার অস্তিত্বের কোনো ধাপই স্থায়ী নয়; বরং প্রতিটি ধাপই এক যাত্রার প্রস্তুতি। যেমন আল্লাহ বলেন,
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
‘আমরা আল্লাহর জন্যই এবং অবশ্যই তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৬)
৩. কোরআনিক দৃষ্টিতে মানুষ এক যাত্রী
আয়াতটি ইঙ্গিত করছে; মানুষ প্রকৃত অর্থে একজন মুসাফির। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি কবরের পরেও সে এক অবিরাম সফরে। তার কোনো অবস্থানই চূড়ান্ত নয়। যে মাটিতে সে জন্মায়, সেই মাটিতেই একদিন তাকে অস্থায়ীভাবে সমাহিত করা হবে; তারপর এক দিন সে পুনরুত্থিত হবে তার প্রকৃত মুস্তাক্বার—আখেরাতের দিকে।
আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَىٰ رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ
‘হে মানুষ! তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে অবিরাম পরিশ্রম করতে করতে অগ্রসর হচ্ছ—অবশেষে তুমি তাঁর সাক্ষাৎ পাবে।’ (সুরা : আল-ইনশিকাক, আয়াত ৬)
সুরা আল-আনআমের ৯৮ নম্বর আয়াত মানুষের অস্তিত্ব ও গন্তব্য সম্পর্কে এক গভীর বাস্তবতা উন্মোচন করে। মানুষ আদম (আ.)-এর বংশধর, তার প্রতিটি জীবনধাপ আল্লাহর নির্ধারিত এক মনজিল। কেউ জানে না সে কোন অবস্থানে কত দিন থাকবে—শুধু জানে, প্রতিটি ধাপের পরেই আছে নতুন এক যাত্রা।
অতএব, দুনিয়া কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; এটি এক অস্থায়ী মুস্তাওদা‘, আর প্রকৃত মুস্তাক্বার হলো আখেরাত। এ কথা অনুধাবনই প্রকৃত “فقه”—অর্থাৎ গভীর উপলব্ধি—যার কথা আয়াতের শেষে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন:
قَدْ فَصَّلْنَا الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَفْقَهُونَ
‘আমি অনুধাবনকারী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।’