ঈদে অসহায় খলিফা উমরের কান্না

আপলোড সময় : ১৪-১০-২০২৫ ১২:২৩:১৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-১০-২০২৫ ১২:২৩:১৮ অপরাহ্ন

ইসলামী ইতিহাসে ন্যায়নিষ্ঠা ও সংযমের যেসব অবিস্মরণীয় উদাহরণ রয়েছে, তার অন্যতম হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)  তিনি ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি পৃথিবীর অর্ধেক ভূখণ্ডে ইসলামের পতাকা উড়িয়েছিলেন, অথচ নিজের জীবনে ছিলেন অসীম সরল, বিনয়ী ও আত্মসংযমী। ঈদের আগের এক ঘটনা তাঁর সেই মানবিক ও আল্লাহভীরু চরিত্রকে আমাদের সামনে নবআলোয় তুলে ধরে।

খলিফার ঘরে ঈদের প্রস্তুতি

খিলাফতের প্রথম দিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বে ছিলেন হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)। একবার ঈদের আগের দিন খলিফার স্ত্রী বললেন,

- আমাদের নতুন কাপড় না হলেও চলে, কিন্তু আমাদের ছোট সন্তানটি ঈদের নতুন কাপড়ের জন্য কাঁদছে।

 
”

 

উত্তরে শান্ত স্বরে উমর (রা.)বললেন, ‘আমার তো নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই।’

তবু সন্তানের কান্নায় মর্মাহত হয়ে তিনি আবু উবাইদা (রা.)-এর কাছে এক মাসের বেতন অগ্রিম দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি পত্র পাঠালেন।

অর্ধ পৃথিবীর শাসকের জন্য অশ্রুভরা উত্তর

চিঠিটি পড়ে আবু উবাইদা (রা.)-এর চোখে পানি এসে গেল। সমগ্র মুসলিম জাহানের খলিফা অগ্রিম বেতনের জন্য আবেদন করছেন।

 
এ দৃশ্য ছিল তাঁর কাছে গভীর আত্মসমালোচনার উপলক্ষ। তিনি বাহককে টাকা না দিয়ে উত্তরে লিখলেন-

 

- ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি যদি এ অর্থ গ্রহণ করতে চান, তবে দুটি প্রশ্নের উত্তর আগে দিন—

  • আপনি কি নিশ্চিত যে আগামী মাস পর্যন্ত জীবিত থাকবেন?
  • আর যদি বেঁচে থাকেন, মুসলমানেরা কি আগামী মাস  পর্যন্ত আপনাকে খিলাফতের দায়িত্বে বহাল রাখবে?”

এই চিঠি পেয়ে হযরত উমর (রা.) গভীরভাবে কেঁদে ফেললেন—এত কাঁদলেন যে তাঁর দাঁড়ি অশ্রুতে ভিজে গেল। কোনো উত্তর লিখলেন না। শুধু হাত তুলে দোয়া করলেন—

- ‘হে আল্লাহ! আবু উবাইদার প্রতি রহম করো, তাঁকে হায়াত দাও’

[এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা উল্লেখ করেছেন ইসলামী ইতিহাসবিদ ইবনুল জাওযী তাঁর “সিফাতুস্‌ সফওয়া” (Sifat al-Safwah, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৪) গ্রন্থে।

 
অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় ইমাম যাহাবীর “সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা” (Siyar A‘lam al-Nubala,খন্ড ১, পৃষ্ঠ ৩৬৯] 

 

তাকওয়া ও ঈদের সত্যিকার বার্তা

এই ঘটনার শিক্ষা শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি আজকের মুসলমানদের জন্যও এক জীবন্ত দিকনির্দেশ। আজ ঈদ মানে বিলাসিতা, অতি ব্যয় ও প্রতিযোগিতার উৎসব। অথচ উমর (রা.)-এর এই আচরণ আমাদের শেখায়, ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য নতুন পোশাকে নয়, বরং বিনয়, সংযম ও দরিদ্রের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই নিহিত।

ঈদ আমাদের শেখায়—অন্যের প্রয়োজনকে নিজের ইচ্ছার ওপরে স্থান দিতে, আল্লাহর সামনে সমর্পিত হতে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহির চেতনা জাগ্রত রাখতে।

খলিফা উমর (রা.)-এর ঈদের কাহিনি আমাদের শেখায়—আসল আনন্দ বস্তুগত প্রাপ্তিতে নয়, আত্মিক পরিশুদ্ধিতে।

 
আসুন, আমরা উমর (রা.)-এর মতো নিজেদের অবস্থান ভুলে না গিয়ে দায়িত্ববোধে অটল থাকি, সমাজের গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াই, এবং ঈদকে করি তাকওয়া, ভালোবাসা ও মানবিকতার উৎসব। কারণ, যেদিন উমর (রা.)-এর চোখের জল বয়ে গিয়েছিল ঈদের আগের রাতে, সেদিন ইতিহাস সাক্ষ্য দিয়েছিল—সত্যিকারের শাসক সে-ই, যে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি নিয়ে ভীত থাকে।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, তা‘মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা। 

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক : সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ 

ন্যাশনাল মিডিয়া হাউজ লিঃ 

ঠিকানা : রিসোর্সফুল পল্টন সিটি, ৮ম তলা, ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন। ঢাকা-১০০০.

ফোন : 0963 8932 732, ই মেইল : news@nationaltimes24.com

অফিস :