মেক্সিকো সরকার একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে হাত দিয়েছে, যার লক্ষ্য হলো প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরকে রেল ও বন্দর সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত করা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী বাণিজ্যে প্যানামা খালের বিকল্প হিসেবে একটি নতুন বাণিজ্য রুট তৈরি হতে পারে।
নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগর ও মেক্সিকো উপসাগরকে সংযুক্তকারী একটি রেল করিডর এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে। রেল অপারেটরদের দাবি, মেক্সিকোর দক্ষিণ অংশে অবস্থিত এ সংক্ষিপ্ত রুট ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পৌঁছতে পানামা খাল বা কানাডার রুটের তুলনায় অনেক কম সময় লাগে।
প্যানামা খাল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট। তবে খরচ, জলসংকট এবং ট্রাফিক জ্যামের কারণে অনেক সময় শিপিং কোম্পানিকে সমস্যায় পড়তে হয়। মেক্সিকোর নতুন রুট যদি কার্যকর হয়, তাহলে এটি সময় ও খরচ কমাতে পারে এবং প্যানামার উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে সক্ষম হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক মাস আগে প্রথম অটোমেকার হিসেবে রুটটি ব্যবহার করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই।
মেক্সিকোর দক্ষিণ অংশে অবস্থিত ইসথমাস অব তেহুয়ানতেপেক, এটি প্রশান্ত মহাসাগর ও মেক্সিকো উপসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী সরু ভূখণ্ড।
গত বছর চালু হয়েছে ৩২৯ কিলোমিটারের লাইন এফএ, যা সালিনা ক্রুজকে পলেঙ্ক শহরের সঙ্গে যুক্ত করে। আরেকটি রুট হলো ৪৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন কে। আগামী বছর চালু হতে যাওয়া লাইনটি গুয়াতেমালার সীমান্তের কাছে সিউদাদ হিগাল্ডো যাবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ইন্টারওশেনিক ট্রেন অব দ্য ইসথমাস অব তেহুয়ানতেপেক (সিআইআইটি) লাইন জেড ব্যবহার করে সম্প্রতি ৯০০টি গাড়ি গন্তব্যে পাঠিয়েছে হুন্দাই। কোরিয়ার কম্পানিটি জানিয়েছে, এ রুটে সময়, খরচ ও পরিচালনায় তারা সন্তুষ্ট।
একক যাত্রায় পণ্যের পরিমাণের দিক থেকে পানামা খালের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে পারবে না রুটটি। তবে সময় ও খরচের দিক থেকে এটি মার্কিন বাজারে পণ্য পৌঁছানোর উল্লেখযোগ্য বিকল্প হতে পারে। কারণ চীনের সাংহাই থেকে আটলান্টা পর্যন্ত রেলপথ ব্যবহার করলে পণ্য পৌঁছতে গড়ে ২৬ দশমিক ৫ দিন লাগে, যা পানামা খালের ৩৩ দিনের তুলনায় কম। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল বা কানাডার রুটে যথাক্রমে ২৭ ও ২৯ দিন লাগে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে স্থল পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে মেক্সিকো পথ ব্যবহার করা আরো সুবিধাজনক। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসী নীতির কারণে শ্রমিক সংকট দেশটির শ্রমঘন শিল্পে সমস্যা সৃষ্টি করছে। তবে পানামা খালের পানির অভাব রেলরুটটিতে বেশি সুবিধা দেবে। ২০২৩-২৪ সালে পানি স্বল্পতার কারণে অনেক জাহাজকে ৪০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় বাজিকো অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ মেক্সিকোয় বিদেশী বিনিয়োগ কম। পানামা খালের বিকল্প রেল করিডর দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদন ও লজিস্টিক হাব তৈরিতে উৎসাহিত করতে পারে। এরই মধ্যে রুট বরাবর ১০টির বেশি শিল্প পার্ক ও গ্যাস পাইপলাইন তৈরি হয়েছে।
ইসথমাস অতিক্রমকারী রেললাইন চালু হয়েছিল গত শতকের শুরুর দিকে, কিন্তু ১৯১৪ সালে পানামা খাল চালুর পর এর ব্যবহার কমে যায়। ১৯৯০-এর দশকের মধ্যে মেক্সিকোয় প্রায় পুরোপুরি ট্রেন পরিষেবা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম প্রশাসন এ পরিষেবা পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে তিন হাজার কিমি রেল নেটওয়ার্ক তৈরি।
তবে এই প্রকল্পের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্যানামা খালের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বড় জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা এবং বিশ্বব্যাপী স্থায়ী ব্যবহার এখনো মেক্সিকোর নতুন রুটকে ছাপিয়ে গেছে। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মাল পরিবহনে গতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন রুটের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষত এশিয়া–আমেরিকা বাণিজ্য যত বাড়ছে, বিকল্প রুটগুলো ততোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মেক্সিকোর এই প্রকল্প যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে এবং দেশটির জন্য বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করবে।