২০ অক্টোবর ২০২৬ , ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

পীরজাদা মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ

উত্তর বঙ্গের মুকুটবিহীন সম্রাট: হযরত মাওলানা ইউসুফ নিজামী রহি..

আপলোড সময় : ২৯-০৮-২০২৫ ০৭:৫৫:৩৫ অপরাহ্ন
উত্তর বঙ্গের মুকুটবিহীন সম্রাট: হযরত মাওলানা ইউসুফ নিজামী রহি..
উত্তর বঙ্গের মাটিতে এক আলোকবর্তিকা হিসাবে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন হযরত মাওলানা ইউসুফ নিজামী রহ। তিনি ছিলেন এক অনন্য আলেম, প্রকৃত শিক্ষক, সমাজসেবক এবং ছাত্রদের প্রতি অন্তহীন দরদী। তাঁর জীবনযাত্রা ও আদর্শ শুধু তার সময়ের মানুষদের নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য এক অনন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।
 
ছাত্রদের প্রতি অগাধ দরদ
 
মাওলানা ইউসুফ নিজামী রহ. ছিলেন ছাত্রদের জন্য অদ্বিতীয়। তিনি শুধু জামিল মাদরাসার ছাত্রদের নয়, উত্তর বঙ্গের সমস্ত মাদরাসার ছাত্রদের প্রতি সমান দায়িত্ববোধ দেখাতেন।
 
সাত নাম্বার রুমে বসে বসে তিনি প্রতিটি মাদরাসার খবর রাখতেন। কোন মাদরাসার বোর্ডিংয়ে কী ধরনের খাবার দেওয়া হচ্ছে, চালের মান কেমন, রান্নার পরিস্থিতি ঠিক আছে কি না—সব কিছু তাঁর নজরের বাইরে থাকত না। ছাত্ররা যদি কোনো কষ্টে থাকত, তাঁর হৃদয় কেঁদে উঠত।
 
একবার তিনি জানতে পারলেন, একটি মাদরাসার বোর্ডিংয়ে দূর্গন্ধযুক্ত ভাত দেওয়া হচ্ছে। ছাত্ররা অত্যন্ত কষ্টে ছিল। অথচ মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সামর্থ্য থাকলেও তারা ভালো চালের ভাত দেওয়া নিয়ে উদাসীন। হুজুরের হৃদয় ব্যথায় মচড়ে উঠল।
 
সামান্য নসিহত, বিশাল প্রভাব
 
কিছুদিন পর, খতমে বুখারী উপলক্ষে ওই মাদরাসার দুই শিক্ষক হুজুরের কাছে সাক্ষাৎ করতে এলেন। হুজুর তাদের সরাসরি কঠোর কিছু বলেননি। তিনি শুধু বললেন:
 
> "তোমরা তালেবে ইলমদেরকে কষ্ট দিচ্ছ, আল্লাহ পাক তোমাদের উপর আবার কোনো মছিবত নাযিল করেন।"
 
এই সামান্য কথায় পরের দিন থেকেই সেই মাদরাসার বোর্ডিংয়ে ভালো চালের ভাতের ব্যবস্থা হলো। এভাবেই হুজুরের দরদে আল্লাহর সাহায্য প্রকাশ পেত।
 
শিক্ষকের নীতিবাক্য
 
হুজুর সবসময় মুহতামিমদের বলতেন:
 
> "ছাত্রদের সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ করে খাবারের প্রতি সর্বোচ্চ যত্নশীল হবেন। তারা আল্লাহ ও রাসূলের মেহমান। তারা আপনাদের কাছে আমানত।"
 
তিনি ছাত্রদের কেবল শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, তাদের দৈনন্দিন জীবনের সব সমস্যার প্রতি সহমর্মিতা দেখাতেন। মাদরাসার শিক্ষক ও মুহতামিমদের কাছে তিনি সর্বদা নির্দেশ দিতেন যেন ছাত্রদের প্রতি যত্ন ও সতর্কতা অব্যাহত থাকে।
 
জীবনের বৃত্তান্ত
 
হুজুরের জীবনে আলেম, শিক্ষক ও সমাজসেবকের তিনটি দিকই অসাধারণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কেবল কিতাবের জ্ঞান দিতেন না; তিনি ছাত্রদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক গঠনেও অবদান রাখতেন। তিনি জানতেন, শিক্ষার সঙ্গে মানবিক ও নৈতিক দিকের সমন্বয় না থাকলে জ্ঞান অপ্রকাশিত থাকে।
 
তিনি ছাত্রদের জন্য সমাজসেবা এবং দানপুণ্যের কাজেও সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন মাদরাসার তালেবে ইলমদের জন্য খাদ্য, আবাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার জন্য তিনি নিজে উদ্যোগ নিতেন। তার দরদ ও পরামর্শে অনেক মাদরাসা উন্নত হয় এবং ছাত্রদের জীবন সহজ হয়।
 
কিতাব ও শিক্ষাজীবন
 
মাওলানা ইউসুফ নিজামী রহ. বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা ছাত্রদের শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক। তার লেখা কিতাবগুলোতে শিক্ষার পাশাপাশি মুসলিম চরিত্র গঠন, মানবিকতা ও সহমর্মিতার গুরুত্ব প্রাধান্য পেয়েছে।
 
ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক
 
হুজুর ছাত্রদের সঙ্গে ছিলেন বন্ধুত্বপূর্ণ, সহমর্মী ও পরামর্শদাতা। তিনি সবসময় চাইতেন, ছাত্ররা যেন কেবল জ্ঞান অর্জন করে না, বরং আদর্শ মানুষ ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠে। তিনি ছাত্রদের পরিবারের অবস্থা, খাদ্য, আবাস এবং মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখতেন। এমনকি তাদের ছোট ছোট কষ্টও তিনি নিজের কষ্টের মতো অনুভব করতেন।
 
জীবনের মূল শিক্ষা
 
হুজুর আমাদের শেখিয়েছেন, শিক্ষক কেবল জ্ঞান দেওয়ার জন্য নয়, মানবিক ও নৈতিক দিক থেকেও ছাত্রদের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। ছাত্ররা আল্লাহ ও রাসূলের মেহমান, তাদের প্রতি যত্ন ও সহমর্মিতা শিক্ষকের প্রথম দায়িত্ব।
 
প্রার্থনা
 
আল্লাহ তাআলা হুজুরের কবরকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। হুজুরের জীবন ও শিক্ষার আলো যেন সমগ্র উত্তর বঙ্গের ছাত্রদের হৃদয় আলোকিত করে। আমরা তাঁর মতো শিক্ষকের দরদ ও মানবিকতা আমাদের জীবনে অনুসরণ করি।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ