২০ অক্টোবর ২০২৬ , ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

হত্যা মামলার আসামি, তবু ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ০৩-০২-২০২৬ ০৪:০৫:৩১ অপরাহ্ন
হত্যা মামলার আসামি, তবু ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী

ঝালকাঠি-২ (ঝালকাঠি সদর-নলছিটি) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সৈয়দ রাজ্জাক আলী সেলিম। তার প্রতীক ‘মোটরসাইকেল’। তবে প্রচারণার মাঝপ‌থে প্রকাশ্যে এসেছে তার এক‌টি মামলার তথ‌্য। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলার আসামি তিনি।

 

 

সৈয়দ রাজ্জাক আলী সেলিম ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। এর আগে ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচ‌নে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়ন বাতিল হলেও আপিলের মাধ্যমে তা বহাল হয়।

এর আগে মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন তার সঙ্গে থাকা দুই ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করে।

 
এসব ঘটনার পরও হত্যা মামলার আসামি হয়েও তিনি নির্বিঘ্নে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ নিয়ে ভোটার, রাজনৈতিক মহল এবং প্রশাসনের ভেতর প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে জানতে চাইছেন, গুরুতর অভিযোগে মামলার আসামি হয়ে একজন প্রার্থী কিভাবে কোনো বাধা ছাড়াই নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় থাকতে পারেন।

 

মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার নথি অনুযায়ী, হত্যার অভিযোগে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন সবুজবাগ থানার বাসিন্দা মীম আক্তার আঁখি।

 
ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি মামলাটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড হয়। 

 

এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৩৮৫ জনকে আসামি করা হয়। হত‌্যা মামলার আসামির তালিকায় সৈয়দ রাজ্জাক আলীর অবস্থান ২২৩ নম্বরে।

যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খালেদ হাসান বলেন, আদালতের নির্দেশে এফআইআর রেকর্ড করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

 
তবে প্রশ্ন উঠেছে, এফআইআর রেকর্ড হওয়ার পরও কেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

 

দুই সহযোগী আটক
মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন, ২৯ ডিসেম্বর ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রার্থীর সঙ্গে থাকা সাদাফ হোসেন ও মাকসুদুর রহমানকে পু‌লিশ আটক করে।

পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক উপাদান আইনে মামলা করা হয়। আদালতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শুনানি শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

হলফনামায় হত্যা মামলার তথ্য নেই
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তা হলফনামায় উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। তবে অভিযোগ উঠেছে, সৈয়দ রাজ্জাক আলী সেলিম হলফনামায় দুটি মামলার তথ্য দিলেও যাত্রাবাড়ী থানার হত্যা মামলার বিষয়ে কোনো উল্লেখ করেননি।

নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হলফনামায় তথ্য গোপন করা হলে তা আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এতে প্রার্থিতা বাতিলেরও সুযোগ থাকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দ রাজ্জাক আলী সেলিম বলেন, ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় পর্যন্ত মামলার বিষয়ে আমার কোনো জ্ঞান ছিল না। তাই হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। বিষয়টি এখন আলোচনায় আসায় যাচাই করছি।

রাজনৈতিক অতীত ও বিতর্ক
রাজ্জাক সেলিম ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বে থে‌কেও বি‌দ্রোহী প্রার্থী হি‌সে‌বে চেয়ারম‌্যান নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালে সহ-সভাপতি পদে থেকে উপজেলা নির্বাচনে ‌বি‌দ্রোহী প্রার্থী হি‌সে‌বে অংশ নেন তিনি। ওই সময় দলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হলে তিনি এলাকা ছেড়ে যান বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।

এ ছাড়া সেলিমের বিরুদ্ধে সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রভাব খাটিয়ে গত ১৫ বছরে তিনি অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগে এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো অনুসন্ধান শুরু করেনি।

পরিবারের ব্যাখ্যা
সৈয়দ রাজ্জাক আলী সেলিমের ছোট ভাই ও এলডিপির নেতা ড. সৈয়দ জহিরুল হক। তি‌নি বলেন, আমাদের পরিবার ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উজবেকিস্তানে গিয়েছিল এবং দেশে ফিরেছি ৩ আগস্ট। রাজ্জাক সেলিম ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাত্রাবাড়ী থানার মামলার বিষয়ে আমরা চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি জানতে পারি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন বরিশালের সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, হত্যা মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও একজন প্রার্থী নির্বিঘ্নে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, হলফনামায় ওই মামলার কোনো তথ্য নেই। এতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। পুরো বিষয়টি আইনি ও নৈতিক সংকটকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে।

প্রশাসনের বক্তব্য
ঝালকাঠি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছি। খোঁজ নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ