জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে মা হারা সারে চার বছর বয়সের শিশুকে নিজ সৎমা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ৩০ নভেম্বর রবিবার জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের গিলাকুড়ি গ্রামে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। নিহত এতিম শিশুটির নাম নাঈম। নাঈমের বাবার অনুপস্থিতিতে সৎমা এমন নির্মম কাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে।
সাড়ে চার বছরের শিশু নিহত নাঈমের মা লিপি খাতুন বিগত ২০২২ সালে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর তিন বছর আগে বাবা নিহত নাঈমের বাবা জলিল শেখ ৩য় বিয়ে করেন জাহানারা বেগমকে। এর পর থেকেই বাবা ও সৎমা জাহানারা বেগমের বাড়িতেই থাকত সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু নাঈম ও তার ৬ বছর বয়সী বোন জান্নাতুন। জাহানারা বেগমের রয়েছে ১৩ মাস বয়সী একটি পুত্রসন্তান।
সেই মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন সৎমা জাহানারা বেগম। আদালতকে তিনি জানান, নাঈম কিছুদিন ধরে শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিল। এ কারণে সে সব সময় বাসায় কান্নাকাটি করত। এতে তিনি বিরক্ত বোধ করতেন।
আদালতে নাঈমের ছয় বছর বয়সী বোন জান্নাতুনও জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে সে বলেছে, তার ভাই নাঈম খেলার সময় অনেক কান্না করতে থাকে। তার কান্না থামাতে সৎমা জাহানারা তার ভাইয়ের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রচুর মারধর করেন। একপর্যায়ে পাশে থাকা বঁটি দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। পরে তাকে বাথরুমের পানিতে চুবান।
জয়পুরহাট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আরিফ হোসেন বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার দায় তিনি স্বীকার করেছেন। এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আদালত জবানবন্দি গ্রহণের পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তদন্তের সব প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত আদালতে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হবে।
নিহত নাঈমের বাবা জলিল শেখ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাড়ে চার বয়সী শিশু নাঈম শেখ খুব শান্ত প্রকৃতির। নিজের মা মারা যাওয়ার পর সৎমায়ের সংসারে বড় হচ্ছিল নাঈম ও তার বোন জান্নাতুন। প্রথম থেকেই জাহানারা তার দুই সৎসন্তানকে সহ্য করতে পারছিলেন না। বিভিন্ন সময় দুষ্টামির অজুহাতে ওই দুই শিশুকে শাসন করার নামে মারধর করতেন। তাদের বাবাও বিষয়টি সাধারণভাবে মায়ের শাসন মনে করতেন। এ বিষয়ে তার কোনো অভিযোগও ছিল না। কিন্তু সেই শাসনের পরিণতি ডেকে আনল তার অকাল মৃত্যু। বিগত ২০১৪ সালে জলিলের ১ম স্ত্রী নার্গিস বানু দুই কন্যা ও এক ছেলেসন্তান রেখে মারা যান। তবে প্রথম স্ত্রীর সন্তানেরা সেই বাড়িতে আসত না।
নিহত নাঈমের বাবা আব্দুল জলিল শেখ বলেন, আমার ছেলে নাঈমকে মাঝেমধ্যে শাসন করত। তবে তাকে ব্যাপক মারধর করতে কখনো দেখিনি। এমনকি সে তার মায়ের বিরুদ্ধে আমাকে কোনো অভিযোগও দিত না। কিন্তু হঠাৎ সেদিন বাড়িতে আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রী তাকে প্রচুর মারধর করেছে। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় নওগাঁ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার আমাকে জানান সে মারা গেছে।
মামলার বাদী শিশুটির মামা এমদাদুল হক বলেন, আমার বোন মারা যাওয়ার পর ভাগিনা নাঈম ও তার বোন সৎমায়ের সংসারে বড় হচ্ছিল। তার সৎমা জাহানারা শাসন করার নামে কারণে-অকারণে তাদের মারধর করত। আমরা বিষয়টি স্বাভাবিক শাসনই মনে করতাম। অবশেষে তাকে পিটিয়ে এবং মাথায় ধারালো বঁটির কোপ দিয়ে হত্যা করেছে। তাকে এমনভাবে পিটিয়েছে, সারা শরীরে কালচে দাগ পড়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।
তিলকপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ পিন্টু বলেন, নাঈমের মৃত্যু ঘটনায় পুরো ইউনিয়নজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সে তার সৎমা দ্বারা নির্যাতিত। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।
জয়পুরহাট জেলা পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা বলেন, শিশু নাঈম হত্যার ঘটনায় আক্কেলপুর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। মামলাটি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিবিরভাবে তদন্ত করছি। আশা করছি, নাঈম হত্যার সুষ্ঠু ও সঠিক বিচার নিশ্চিত হবে।