মাদরাসার ছাত্র থেকে কাবুলের মসনদে
তালেবানদের ক্ষমতায় যাওয়া ও ইমারতে ইসলামীয় আফগান আজ সারা দুনিয়ার সামনে এক রোল মডেল। মাদরাসা ছাত্র থেকে তারা কীভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আজ তা এক বিরাট আত্মত্যাগের ইতিহাস। আফগানিস্তানের ইতিহাস হলো সংগ্রাম, যুদ্ধ এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস। বহিরাগত শক্তির আক্রমণ, অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে দেশটি একের পর এক সংকট মোকাবিলা করেছে।
এই অস্থির প্রেক্ষাপটেই তালেবানদের উত্থান ঘটে, যারা মাদ্রাসাভিত্তিক এক প্রজন্মের নেতৃত্বে আফগানিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। মাদ্রাসা থেকে উত্থান ১৯৮০–এর দশকে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের বিজয়ের পর দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর দখলদারিত্বে সাধারণ মানুষ নিপীড়িত হতে থাকে। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলোতে তখন এমন এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছিল, যারা ইসলামী শরিয়াহ ও জিহাদের আদর্শে শিক্ষিত। তাদের মধ্য থেকেই "তালেবান" নামক আন্দোলনের জন্ম হয়—"তালেবান" অর্থাৎ "জ্ঞানার্জনের ছাত্ররা"।
তালেবানদের প্রথম উত্থান ১৯৯৪ সালে কান্দাহারের আশেপাশের এলাকায় তারা প্রথম প্রভাব বিস্তার করে। দ্রুতই জনগণের আস্থা অর্জন করে, কারণ তারা ডাকাতি, দুর্নীতি ও গোষ্ঠীগত যুদ্ধের অবসান ঘটায়। ১৯৯৬ সালে তারা রাজধানী কাবুল দখল করে “ইমারতে ইসলামীয় আফগান” ঘোষণা করে। পতন ও পুনরুত্থান ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী আল-কায়েদা ও তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তাদের শাসনের পতন ঘটে। আফগানে আমেরিকা মিত্র বাহিনী বর্বর হামলা চালায়। কিনৃতু দমে থাকেনি মাদরাসার এই ছাত্ররা। দুই দশক ধরে তালেবানরা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়, একদিকে বিদেশি সেনাদের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে মার্কিনপন্থী কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে। আফগান পাহাড়ি গ্রাম, সীমান্তবর্তী মাদ্রাসা ও জিহাদী ঘাঁটি থেকে তারা ক্রমশ শক্তিশালী হয়। ২০২১: ক্ষমতার পুনরাগমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। মাত্র কয়েক মাসে তালেবানরা প্রায় পুরো আফগানিস্তান দখল করে নেয়।
১৫ আগস্ট ২০২১ সালে তারা কাবুলে প্রবেশ করে, প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ত্যাগ করেন। আবারো কাবুলের মসনদে বসে তালেবানরা “ইমারতে ইসলামীয় আফগান” পুনঃঘোষণা করে। ইমারতের চ্যালেঞ্জ তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর একদিকে জনগণের কাছে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার জনয় কাজ করছে। খোদ চীন রাশিয়ার মতো পরাশক্তি তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে৷ অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য, বিদেশি সহায়তার উপর নির্ভরতা ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক চাপে তাদের শাসন টিকে থাকার বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়ার ক্ষতা থাকলেও দক্ষতার সাথে তা থেকে তারা অগ্রসর দেশে রূপ লাভ করছে। মূলত তালেবানদের কাহিনি এক প্রজন্মের গল্প, যারা সীমান্তবর্তী মাদ্রাসা থেকে উঠে এসে কাবুলের ক্ষমতার আসনে বসেছে।
মোল্লা উমর তাদের সাহসী নেতৃত্বের প্রেরণা। বিন লাদের সেই প্রেরনায় সাহস ও শক্তির সঞ্চার করে তাদের সমৃদ্ধি করেছিলেন। তাদের শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিশ্ব ব্যাপী আলোচনা থাকলেও আফগান জনগণের একটি বড় অংশের সমর্থন ও প্রতিরোধ উভয়ই তারা পেয়েছে। তারা দেশকে ক্রমশ উন্নত ও আবিষ্কারের বিস্ময়কর রোল মডেলে দুনিয়ার সামনে তুলে ধরছে৷ বিশ্বের একমাত্র সন্ত্রাস রাহাজানী আর দর্নীতিমুক্ত দেশ। আজ আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—এই নতুন ইমারতে ইসলামীয় আফগান নতুন এক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর। আফগানিস্তানের ইতিহাস : সোভিয়েত যুদ্ধ থেকে তালেবান শাসন ১৯৭৯ – সোভিয়েত আগ্রাসন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানে তাদের সমর্থক সরকারকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু এই আগ্রাসন মুসলিম বিশ্বে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পাকিস্তান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ আফগান মুজাহিদিনদের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিতে শুরু করে।
১৯৮০–১৯৮৯ – আফগান মুজাহিদিনের লড়াই এই দশকজুড়ে আফগানিস্তান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জর্জরিত থাকে। বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠী “মুজাহিদিন” নামে সংগঠিত হয়ে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালায়। একই সময়ে সৌদি আরবের ধনকুবের যুবক উসামা বিন লাদেন পাকিস্তানে এসে আফগান জিহাদে যোগ দেন। পরে তিনি আরব যোদ্ধাদের একত্রিত করে “আল-কায়দা” নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
১৯৮৮ – আল-কায়দার জন্ম সোভিয়েত বাহিনী দুর্বল হতে শুরু করলে আরবের উসামা বিন লাদেন “আল-কায়দা” নামের একটি সংগঠন গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে “জিহাদ” ছড়িয়ে দেওয়া।
১৯৮৯ – সোভিয়েত পরাজয় ও মুজাহিদিনদের বিজয় ফেব্রুয়ারি মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে। আফগানিস্তান স্বাধীন হয়, কিন্তু একীভূত নেতৃত্ব গড়ে না ওঠায় মুজাহিদিনদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৯২ – নাজিবুল্লাহ সরকারের পতন সোভিয়েত-সমর্থিত প্রেসিডেন্ট ড. নাজিবুল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে মুজাহিদিনরা কাবুল দখল করে। কিন্তু হিজব-ই-ইসলামী, জামিয়াত-ই-ইসলামী, শিয়া ও অন্যান্য দল নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার জন্য ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৯৪ – তালেবান আন্দোলনের জন্ম দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহারে মোল্লা মুহাম্মদ ওমর কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে একটি নতুন আন্দোলনের সূচনা করেন। নাম রাখা হয় “তালেবান” (ছাত্ররা)। তারা শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা ও দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে। স্থানীয় জনগণ তাদের প্রতি আস্থা রাখতে শুরু করে।
১৯৯৬ – তালেবান কাবুল দখল মাত্র দুই বছরের মধ্যে তালেবান শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং কাবুল দখল করে। “ইসলামিক এমিরেট অব আফগানিস্তান” নামে রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লাহকে হত্যা করা হয়। এ সময় উসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় পান এবং তালেবান সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে ওঠেন।
১৯৯৮ – আল-কায়দার বৈশ্বিক হামলা উসামা বিন লাদেন আমেরিকার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন।
২০০১ – সেপ্টেম্বর ১১ হামলা ও তালেবান পতন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হয়। যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে উসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে তাকে তাদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানায়, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়। তালেবান সরকার পতিত হয়, মোল্লা ওমর আত্মগোপনে চলে যান। ২০০২–২০১০ – তালেবান পুনর্গঠন তালেবানরা পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হয়। তারা আফগান সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। ২০১১ – উসামা বিন লাদেন নিহত পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বিশেষ বাহিনী অভিযান চালিয়ে উসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। এটি আল-কায়দার জন্য বড় ধাক্কা হলেও তালেবান যুদ্ধ চালিয়ে যায়। মাদরাসার এই ছাত্ররা দমে যায় নি।
২০১৩ – মোল্লা ওমরের মৃত্যু দীর্ঘ গোপনীয়তার পর মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। আসলে তিনি ২০১৩ সালের আগেই মারা যান, কিন্তু বিষয়টি তালেবান গোপন রেখেছিল বল ধারনা করা হয়।
২০১৫–২০১৬ – নতুন নেতৃত্ব মোল্লা আখতার মনসুর তালেবান নেতা হন, কিন্তু ২০১৬ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। এরপর হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নতুন আমির নিযুক্ত হন। ২০২০ – দোহা চুক্তি একদিকে জিহাদ আরেক দিকে মাদরাসার এই ছাত্ররা কাতারে তারা কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। তারা এই কূটনৈতিক জিহাদে সফল হন। যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান কাতারের দোহায় ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নির্ধারিত হয় এবং তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়।
২০২১ – তালেবান পুনঃউত্থান আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করলে দ্রুত তালেবান দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৫ আগস্ট তারা কাবুল দখল করে এবং আবারও “ইসলামিক এমিরেট অব আফগানিস্তান” ঘোষণা করে। প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এভাবেই সোভিয়েত যুদ্ধের মুজাহিদিন মাদরাসার ছাত্র থেকে মোল্লারা হয়ে উঠে খেলাফতের প্রয়াসী। তাদের অসীম সাহস ও রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক তৎপরতার কাছে হারমানে বিশ্বের সুপার পাওয়ার পরাশক্তি। মোল্লা ওমরের তালেবান শক্তিশালী হয়ে উঠে আরব বীর উসামা বিন লাদেনের আল-কায়দা হয়ে, তাদের মেধা ও শানিত চেতনার পুস্ফটিত রূপ আজ ইমরাতে ইসলানীয়া আফগান। অবশেষে ২০২১ সালে তালেবানদের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত ইতিহাস গড়ে ওঠে তা বিশ্বের জন্য এক নজিরবিহীন ঘটনা।
কমেন্ট বক্স