২৩ অক্টোবর ২০২৬ , ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৫ ০৬:২০:৩২ অপরাহ্ন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে

তিনি হাঙ্গেরির ক্রাসনাহোরকাই  (Krasynahorkai)। আধুনিক সাহিত্যের এক বিরল ও দৃষ্টিনন্দন শক্তি। ২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি- নোবেল কমিটির ভাষায়, ‘তার সেই দৃষ্টিনন্দন, বিষণ্ণ অথচ মহিমান্বিত গদ্য রচনার জন্য, যা বিশৃঙ্খলা ও ভয়ের মধ্যেও মানবতার শিল্পসত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে।’
১৯৫৪ সালের ৫ জানুয়ারি হাঙ্গেরির ছোট শহর জিউলাতে তাঁর জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সাহিত্যেই স্থায়ী আশ্রয় নেন। তার জীবনযাপন নিভৃত ও সংযতÑ তিনি প্রায়ই হাঙ্গেরির পাহাড়ি অঞ্চলে একাকী সময় কাটান, লেখেন, ভ্রমণ করেন, আর চীনা ও জাপানি সংস্কৃতির দর্শন নিয়ে চিন্তা করেন।
তার প্রথম উপন্যাস Sátántangó (১৯৮৫) প্রকাশের পরই ইউরোপীয় পাঠকসমাজে আলোড়ন ওঠে। উপন্যাসটি এক দুর্বোধ্য অথচ মন্ত্রমুগ্ধকর গদ্যে রচিতÑ যেখানে অর্থনৈতিক ধ্বংস ও আধ্যাত্মিক নিঃশেষের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্রামীণ সমাজের কাহিনী বলা হয়। এই বই পরে পরিচালক ইল্কষধ ঞধৎৎ চলচ্চিত্রে রূপ দেন, যা আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রে একটি কাল্ট ক্লাসিক।
তার দ্বিতীয় বড় কাজ The Melancholy of Resistance (১৯৮৯) মানবসভ্যতার পতন ও নৈতিক শূন্যতার এক দার্শনিক কাব্য। এরপর আসে War & War (১৯৯৯), যেখানে এক সরকারি কেরানির চোখ দিয়ে দেখা যায় মানবতার শেষ সংগ্রামÑ যুদ্ধ, ইতিহাস ও ভাষার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার এক মরিয়া প্রচেষ্টা। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ঝবরড়ন- There Below-তে তিনি প্রাচ্যের শিল্প, বিশেষত জাপানি নন্দনতত্ত্বকে কেন্দ্র করে এক আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান রচনা করেন।
তার গদ্যকে বলা হয় ‘অবিরাম বাক্যের নদী’- তিনি প্রায়ই কয়েক পৃষ্ঠা দীর্ঘ বাক্যে মানব চিন্তা ও সময়ের প্রবাহকে একাকার করে দেন। তার লেখায় আছে গভীর দার্শনিক সুর, এক ধরনের মহাজাগতিক বিষণ্ণতা- যখানে ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি, প্রকৃতি ও মৃত্যুর ধারণা মিশে যায়। কেউ কেউ বলেন, ক্রাসনাহোরকাই এমন এক লেখক যিনি কেবল শব্দ নয়, বাক্যের ভেতর দিয়ে ‘সময়’-কে বুনে দেন।
তিনি ২০১৫ সালে Man Booker International Pri“e পেয়েছিলেন, আর এখন ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কার জয় তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক সাধনার স্বীকৃতি। তাঁর লেখাকে অনেকেই ফ্রান্জ কাফকা, স্যামুয়েল বেকেট বা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ধারাবাহিকতায় রাখেন, যদিও তিনি নিজে কাউকেই অনুসরণ করেন ভাষাকে এক অস্তিত্ববাদী সংগ্রামের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন।
আজকের বিশ্বসাহিত্যে লাসলো ক্রাসনাহোরকাই এক অনন্য কণ্ঠ- যিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং তা মানব আত্মার গভীরতম প্রতিধ্বনি।

 

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই-এর সঙ্গে কথোপকথন
সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন হরি কুন্ঝরু, অনুবাদ : কল্পনা রায়
(প্রকাশিত : ঞযব ণধষব জবারব,ি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)
প্রশ্ন:
আপনার গল্প ‘An Angel Passed Above Us’ -এ ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমি ব্যবহার করেছেন। এই যুদ্ধ আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে- একজন মানুষ, একজন ইউরোপীয় এবং একজন লেখক হিসেবে?
ক্রাসনাহোরকাই :
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে- আমি প্রায় সেটাই অনুভব করি।
মানুষ যেন কিছুই শেখেনি।
হাঙ্গেরি ইউক্রেনের পাশের দেশ, অথচ আমাদের সরকার ‘নিরপেক্ষতা’র কথা বলে।
আমি ভেবে পাই না, কীভাবে একটি দেশ নিরপেক্ষ থাকতে পারে যখন তার পাশের মানুষগুলো প্রতিদিন মরছে, যখন রুশ সেনারা অন্যের ভূমি দখল করছে।
এটা কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং এক নৈতিক প্রশ্ন।
যে দেশ এমন সময়ে নীরব থাকে, সে নিজের আত্মাকে হারায়।
এবং আমাদের সবাইকে সেই দায় নিতে হয়- কারণ আমরা সবাই এই পৃথিবীর বাসিন্দা।
প্রশ্ন:
এই গল্পে আপনি আহত সৈনিক ও এক সহৃদয় মহিলার কথোপকথনের মধ্যে এক ধরনের ‘দৈব আশ্রয়’ দেখিয়েছেন। যুদ্ধের এই ভয়াবহতার মধ্যে আশা কোথায় পেলেন?
ক্রাসনাহোরকাই :
আশা সব সময়ই থাকে, কিন্তু তা দেখা যায় না।
মানুষ আহত হয়, ক্লান্ত হয়, ভেঙে পড়ে- তবু এক ক্ষীণ আলোর মতো কিছু ভেতরে জ্বলতে থাকে।
আমি বিশ্বাস করি, সেই আলোই শিল্প।
একজন লেখক, একজন শিল্পী কেবল সেই অদৃশ্য আলোর সাক্ষীÑ তার কর্তব্য সেটিকে শব্দে রূপ দেওয়া।
এই গল্পের মহিলা চরিত্রটি কোনো বীর নয়, কোনো মুক্তিদাতা নয়Ñ সে কেবল একজন মানুষ, যে অন্য একজন মানুষকে ভুলে যেতে দেয় না যে সে এখনো বেঁচে আছে।
এটাই আসলে মানবতার মূল।
প্রশ্ন:
আপনি প্রায়ই ‘অ্যাপোক্যালিপ্স’ বা ‘বিনাশ’ নিয়ে লেখেন। আপনার কাছে এই ধারণাটি কীÑ একটি হঠাৎ বিপর্যয়, নাকি এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া?
ক্রাসনাহোরকাই :
অ্যাপোক্যালিপ্স কোনো একক ঘটনা নয়Ñ এটি একটি ধীরে চলা প্রক্রিয়া।
মানুষের ইতিহাসে এই প্রক্রিয়া বহুবার শুরু হয়েছে, বহুবার চলেছে, এখনো চলছে।
আমরা এখন অ্যাপোক্যালিপ্সের মধ্যেই আছিÑ শুধু সেটিকে স্বীকার করি না।
যখন পৃথিবীর মাটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়, নদী বালিতে হারিয়ে যায়, প্রাণীরা পালায়, ভাষা অর্থ হারায়Ñ তখনই বিনাশ শুরু হয়।
কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই শিল্প জন্ম নেয়।
যে জায়গায় সবকিছু শেষ, ঠিক সেখানেই কোনো একজন লেখক নতুন বাক্য লেখেÑ এটাই পুনর্জন্মের চিহ্ন।
প্রশ্ন:
আপনি বলেছেন ‘আশা ভবিষ্যতের অধিকার, কিন্তু ভবিষ্যৎ কখনো আসে না।’ এই ধারণাটিকে একটু ব্যাখ্যা করবেন?
ক্রাসনাহোরকাই :
মানুষ সব সময় ভবিষ্যতের কথা ভাবেÑ আমরা বলি, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু সেই ‘একদিন’ কোনোদিন আসে না।
আমরা কেবল এই বর্তমানেই বেঁচে আছিÑ এখানে, এখন।
সুতরাং, যদি কোনো মুক্তি থাকে, তা আজই, এই মুহূর্তেই।
আশা কোনো দূরের বিষয় নয়;
আশা হলো বর্তমানের ভেতরে লুকানো এক ক্ষণস্থায়ী ঝলক।
তুমি সেটা দেখলে বাঁচো; না দেখলে ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হও।
প্রশ্ন:
আপনার গল্পে শিল্প ও নৈতিকতার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আপনি কি মনে করেন শিল্প এখনো মানুষকে রক্ষা করতে পারে?
ক্রাসনাহোরকাই :
হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি শিল্প এখনো পারেÑকিন্তু সেটা ‘রক্ষা’র অর্থে নয়।
শিল্প আমাদের বাঁচায় না, বরং আমাদের ‘বোধ’ করায়।
একজন মানুষ যখন কোনো চিত্র, কোনো বাক্য বা কোনো সুরে নিজের ছায়া দেখতে পায়, তখন সে জানেÑ সে একা নয়।
এই ‘একাকিত্ব ভাঙা’র মুহূর্তটাই শিল্পের বিজয়।
শিল্প আমাদের দেয় নতুন অনুভবের ক্ষমতাÑ 
দুঃখকে দেখা, ভয়কে চিনে নেওয়া এবং সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।
যতক্ষণ মানুষ এই ক্ষমতা রাখবে, পৃথিবী পুরোপুরি ধ্বংস হবে না।
প্রশ্ন:
আপনি কি মনে করেন, ভাষা এই ভয়াবহ বাস্তবতা বহন করার মতো শক্তিশালী?
ক্রাসনাহোরকাই :
ভাষা ভেঙে পড়ছেÑ এ কথা আমি প্রায়ই বলি।
কিন্তু ভাষার ভেতরেই আমাদের শেষ আশ্রয়।
যখন মানুষ কথা বলে, লেখে, বা চুপ করে শোনেÑ তখনই কিছু একটা টিকে থাকে।
আমার উপন্যাসে আপনি দেখবেন, বাক্য কখনো শেষ হয় না।
কারণ আমি বিশ্বাস করি, কোনো ভাবনা, কোনো অনুভূতি আসলে ‘শেষ’ হয় না।
যখন একটি বাক্য এগিয়ে চলে, সেটি সময়ের মতোÑ ক্রমাগত, অবিরাম।
এই কারণেই আমি বিরামচিহ্নের বদলে প্রবাহ খুঁজি; আমি চাই বাক্যটিও শ্বাস নিক, যেমন একজন মানুষ নেয়।
শেষ প্রশ্ন : যুদ্ধ, মৃত্যু, একাকিত্বের মধ্যে আপনি এখনো লিখছেন কেন?
ক্রাসনাহোরকাই :
কারণ লেখা ছাড়া আমি কিছুই করতে পারি না।
যখন আমি লিখি, তখন আমি ভয় পাই না।
লেখা আমার কাছে এক ধরনের প্রার্থনা,
যেখানে শব্দ দিয়ে আমি পৃথিবীকে আবার সাজিয়ে দেখি।
আমি বিশ্বাস করি-
যখন মানুষ শেষবারের মতো শব্দ উচ্চারণ করবে,
সেই শব্দটি হবে ভালোবাসার।
ততক্ষণ পর্যন্ত, আমি লিখে যাবো।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ