রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায় গৃহপালিত গরুর শরীর থেকে মানব দেহে অ্যানথ্রাক্স জীবানু সংক্রমিত হচ্ছে। ছাগলের মাংসের সংস্পর্শে এসেও আক্রান্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে। এই রোগে পীরগাছা উপজেলায় এ পর্যন্ত ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। রোগাক্রান্ত গরুর সংখ্যা পাঁচ শতাধিক দাঁড়িয়েছে। শতাধিক গরু মারা গেছে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ছোট-বড় খামারিরা। অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ একটি তীব্র ও গুরুতর সংক্রামক রোগ, যা ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক তাহমিনা শিরীন যুগান্তরকে বলেন, অ্যানথ্রাক্সের বিষয়টি জানার পর গত ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর আইইডিসিআরের একটি প্রতিনিধিদল রংপুরের পীরগাছা সদর এবং পারুল ইউনিয়নে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ থাকা ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আটজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। অ্যানথ্রাক্সে মৃত্যুর বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মারা যাওয়ার বিষয়টি জানি না। কারণ তাদের স্যাম্পল (নমুনা) আমরা পরীক্ষা করিনি।’ পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন এ রকম ৩০ জনের অধিক রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এ কথা জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ তানভীর হাসনাত। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৫০ জন রোগীর তথ্য তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। বিভিন্ন এলাকায় মেডিকেল টিম পাঠিয়ে তারা ১৫-২০ জন রোগীর সঙ্গে দেখা করেছেন। আক্রান্তরা এখন অনেকেই সুস্থ হয়েছেন।
জানা যায়, গত তিন মাস আগে থেকে এই রোগ শুরু হলেও এখনো তা নিয়ন্ত্রনে আসেনি। ছাগলের মাংসের সংস্পর্শেও অ্যানথ্রাক্স সংক্রমের তথ্য মিলেছে। যা আরও উদ্বেগের বিষয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সঠিকভাবে রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি দিনদিন জটিল ও কঠিন আকার ধারণ করছে।
খামারিরা বলছেন, আক্রান্ত পশুগুলোর শরীরে ক্ষত সৃষ্টি, সামান্য জ্বর, পাতলা পায়খানা দেখা দেয়। যা অ্যানথ্রাক্স রোগের উপসর্গ বলে দৃশ্যমান হয়। হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে দ্রুত কমে যায়, শরীরের ক্ষতগুলো বড় ধরনের সংক্রমিত হয়। এরপরই পশুগুলো মারা যাচ্ছে। রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়ায় তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র বলছে, গত জুলাই ও সেপ্টেম্বরে পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে দুজন মারা গেছেন। একই সময়ে অ্যানথ্রাক্স রোগে উপজেলার চারটি ইউনিয়নে সরকারি হিসাব মতে অর্ধশত ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন। এ ঘটনাস্থল থেকে অসুস্থ গরুর মাংসের নমুনা পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত করেছিল প্রাণিসম্পদ বিভাগ। পরে আইইডিসিআরের একটি প্রতিনিধিদল গত ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর পীরগাছা সদর এবং পারুল ইউনিয়নের অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ থাকা ১২ নারী-পুরুষের নমুনা সংগ্রহ করে। এদের ৮ জনের দেহে অ্যানথ্রাক্স রোগ শনাক্ত হয়।
আইইডিসিআরের পরীক্ষায় ফ্রিজে রাখা গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া গেছে। অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে, এমন একজন ছাগলের মাংসের সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়েছেন-এমন কথাও সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানিয়েছে। এটি একটি নতুন ঘটনা বলে তারা মনে করেন। কারণ অ্যানথ্রাক্স শুধু গরুর দেহে সংক্রমিত হয়।
অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ নিয়ে পীরগাছার দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় মুহম্মদ তানভীর হাসনাত বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি দাবি করেন মৃত দুজনের মেডিকেল রিপোর্ট তারা (আইইডিসিআর) দেখেছেন। এ দুটি মৃত্যু অ্যানথ্রাক্সের কারণে নয়। তবে উভয়ের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ছিল। কিন্তু মৃত্যুর কারণ তিনি পরিষ্কার করে বলতে পারেননি।
চিকিৎসকরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গবাদিপশুর শ্লেষ্মা, লালা, রক্ত, মাংস, হাড়, নাড়িভুঁড়ির সরাসরি সংস্পর্শে এলে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। এ রোগ গবাদিপশু থেকে মানুষে ছড়ায়। তবে কোনো মানুষ আক্রান্ত হলে তার মাধ্যমে অন্য মানুষের দেহে সংক্রমিত হয় না। এ রোগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে শরীরের চামড়ায় ক্ষত বা ঘা সৃষ্টি হওয়া। এ জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগকে গরু-ছাগলের প্রতিষেধক টিকা কার্যক্রম জোরদার করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অ্যানথ্রাক্স রোগাক্রান্ত গরুর সংখ্যা বেড়েছে। অনেক খামারি হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। কেউ কেউ অসুস্থ গরু-ছাগল কম দামে বিক্রি করছেন স্থানীয় কসাইদের কাছে। এ কারণে কসাইখানা থেকেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। খামারি মশিয়ার রহমান ও তাম্বুলপুর এলাকার কৃষক ফজলুর রহমান বলেন, হঠাৎ করেই তাদের গরু রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. একরামুল হক মন্ডল বলেন, আমাদের দুটি টিম চিকিৎসা এবং দুটি টিম ভ্যাকসিন প্রয়োগে মাঠে কাজ করছে। আমরা ভ্যাকসিন ক্যাম্প চালু করেছি।
রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল হাই সরকার বলেন, আমরা পীরগাছার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছি এবং কিছু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ১৫ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ঈদুল আজহার সময় কিছু অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরু জবাই হয়েছিল বলে জেনেছি। বর্তমানে সেই রোগ নেই। তবে যাতে নতুন করে রোগ না হয়, সেজন্য পীরগাছায় ৬০ হাজার গবাদিপশুকে ভ্যাকসিন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রংপুরে সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, এটা শুধু পীরগাছা নয়, পরবর্তী সময়ে কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরেও আমরা একই ধরনের উপসর্গের রোগী পেয়েছি। ইতোমধ্যে আরও আট রোগীর নমুনা আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। সে রিপোর্ট এখনো আসেনি। অসুস্থ গবাদিপশু জবাই ও অসুস্থ প্রাণীর মাংস না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সিভিল সার্জন। রংপুরের ডেপুটি সিভিল সার্জন রুহুল আমিন জানিয়েছেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক মজুত আছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীদের ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসা দেওয়ার মতো সময় পাওয়া যায় না। এজন্য গবাদিপশুকে টিকাদান জরুরি। এ রোগে খুব দ্রুত মৃত্যু ঘটে এবং মৃতদেহের নাক, মুখ ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে কালো রক্ত বেরিয়ে আসে।
মানুষের ক্ষেত্রে চামড়ায় কালো ব্লিস্টার বিশেষত মুখ, হাত ও পায়ে হতে পারে। নিশ্বাসের মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্র আক্রান্ত হলে শ্বাসকষ্ট ও মৃত্যুও ঘটতে পারে। খাদ্যের মাধ্যমে অন্ত্রে প্রবেশ করলে মুখে ঘা, পেটে ব্যথা এমনকি রক্তবমিও হতে পারে।